ধর্ম বিশ্বাস সংশোধনের উপায়
নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ পাকের জন্য। আমরা তার প্রশংসা
করছি, তার নিকট সাহায্য চাচ্ছি, ক্ষমা চাচ্ছি এবং তারই উপর ঈমান আনছি। আর আমাদের
নফসের কুমন্ত্রণা এবং খারাপ আমল করা হতেও সাহায্য চাচ্ছি।
আল্লাহ তাআলা যাকে
হেদায়েত করেন কেউ তাকে গোমরাহ করতে পারে না, আর যে গোমরা হয় কেউ তাকে হিদায়াত করতে
পারে না। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোন মাবুদ নেই, তিনি
এক এবং তার কোন অংশীদার নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই মুহাম্মদ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বান্দা ও প্রেরিত রাসুল।
বড়দের মর্যাদার মাপকাঠি
সবকিছু আমার জানা আছে অথবা আমার জানা বস্তুটিই সঠিক এমন দাবী স্বয়ং নবী
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও করেননি। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লামকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি আল্লাহর আদেশে বললেন: এটা আল্লাহর একটি আদেশ মাত্র। আর আমাকে জ্ঞানের সামান্য দেয়া হয়েছে। এ হলো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী মানবের নিজের বিষয়ে মন্তুব্য। তা ছাড়া কোন
কোন সিদ্ধান্তে তাঁর চেয়ে অন্য সাহাবী- উমর রা. এর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল বলে ও মহান
গ্রন্থ কুরআনে এসেছে। এতে প্রতিয়মান হয় যে, ভুল আমাদের পিছু ধাওয়া করে। আমরা দীর্ঘ সময় যাবৎ
পালন করে আসা আমাদের কোন কাজ, মত, আদর্শ পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হলে তা ত্যাগ করা
দোষণীয় নয় । এটা আমাদের পূর্ববর্তীদের আমলও ছিল। এমনিভাবে বিশ্বাস করতে হবে আমাদের
অনুকরণীয় ব্যক্তিবর্গও ইমাম, পীর, দরবেশ, শিক্ষক, অথবা পার্থিব কোন নেতা ভুলের
উর্দ্ধে নয়। সবক্ষেত্রে তাদের কথাই আমল
করতে হবে এবং তাদের সব কথা ও কাজ নির্ভুল তাও অবাস্তব। কারণ এমন অন্ধ বিশ্বাসের
ফলে বহু ক্ষেত্রে কুরআন ও সহীহ হাদীস মোতাবেক আমল করা সম্ভব হয় না। যা বড় ধরণের
অপরাধ।
মুসলিমদের জন্য এটাই কর্তব্য হওয়া উচিত যে, সে আল্লাহর ইবাদত ঐ ভাবে করবে,
যেভাবে তিনি তার কিতাবে নির্দেশ দিয়েছেন, আর যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লামের সহীহ সুন্নাতের মধ্যে নির্দেশিত
হয়েছে। তারপর এই দুই মূল ভিত্তি হতে যে সমস্ত হুকুম আহকাম বের হয়েছে, সে অনুযায়ী
সে চলবে। আর এ জাতীয় হুকুম আহকামের মূলসূত্রগুলো বের করা সকলের জন্য সহজ নয়। সে
কারণেই আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের কল্যাণার্থে বহু সম্মানী আলেমদের আভির্ভাব
ঘটিয়েছেন। সাহাবা, তাবেয়ীন এবং তাদের
পরবর্তীগণের মধ্য হতেও। তারা আল্লাহ তাআলার দ্বীনকে উত্তমভাবে অনুধাবন করেছেন। আর
সাথে সাথে আল্লাহর কিতাব ও নবীর সুন্নাহকে খুবই সুক্ষ্ণভাবে বুঝতে সচেষ্ট হয়েছেন। তারপর
সেখান থেকে হুকুম আহকাম বের করার প্রয়াস পেয়েছেন। ফলে, তারা সাধারণ লোকদের সম্মূখে
ঐ সসস্ত আহকামকে এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যাতে তারা সঠিক দিক নির্দেশনা পেয়ে হিদায়াত
ও সঠিক বুঝের উপর চলতে সক্ষম হন। তারা
তাদের সাধ্যমত যে কষ্ট মেহনত করেছেন, তাতে আল্লাহ তাআলা তাদের উপর রাজী খুশী হয়ে
গেছেন।
সুক্ষ এ কাজ করতে গিয়ে গবেষণা কর্মে তাদের কোন কোন কথা ও কাজ অপরের সাথে
বিরোধপূর্ণ হয়েছে। আর কখনও কোন মাসআলায়
তারা একাধিক ফতোয়া দিয়েছেন, এরও অনেক কারণ রয়েছে যা আলোচনায় আসছে। এবং মতবিরোধ এমন
পর্যায় যায়নি যে তাদেরকে দোষ দেয়া ওয়াজিব বা মুবাহ হয়ে দাড়ায়। বরং প্রতিটি মুসলিম
ঐ কথাকে গ্রহণ করেছেন, যা তিনি দলীলসহ সহীহ মনে করেছেন এবং তার উপরই তিনি আমল
করেছেন। আর যে ব্যক্তি দলীল খুজতে অপারগ, তিনি কোন আমলওয়ালা বিশ্বাসী মুত্তাকী
মুফতিকে প্রশ্ন করে তা গ্রহণ করে তার উপর আমল করেছেন।
অনর্থক বিতর্কে লাভ হয় শত্রুপক্ষের
যখন লোকেরা তাদের পছন্দনীয় কোন কোন ব্যক্তি ও তাদের বক্তব্যসমূহকে অন্ধভাবে
দৃঢ়তার সাথে আকড়ে ধরতে থাকে। সাথে সাথে তাদের নানা ধরণের কামালিয়াত ও প্রশংসা করতে
থাকে। তাদের ফজল, তাকওয়া ও ইলমের প্রশংসা করতে থাকে। আর অন্যদের যে দোষত্রুটি আছে
তা প্রচার করতে থাকে এবং তাদের যে ভাল গুণাবলী আল্লাহ তাআলা দান করেছেন তা উপেক্ষা
করতে থাকে, তখন ইসলামের শত্রুরা এই সুযোগ কাজে লাগায়। তারা এই সমস্ত মতবিরোধের
সুযোগ নিয়ে নিজেদের নিকৃষ্ট উদ্দেশ্য সাধনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আর তাদের ভিতরের ঘৃণ্য
উদ্দেশ্যসমূহকে হাসিল করার জন্য মুসলিমদের মধ্যে আরও বিরোধ সৃষ্টি করতে তৎপর হয়।
এর ফলশ্রুতিতে উম্মত নানা মত ও দলে বিভক্ত হতে থাকে। তাদের মধ্যে নানা ফিরকাহ ও মাযহাবেরর
সৃষ্টি হয়। ফলে প্রচণ্ডভাবে তর্কযুদ্ধ চলতে থাকে। নানা ধরনের কথাবর্তা চলতে থাকে,
আর আমলে ঘাটতি হতে থাকে। আর তখন হতেই যারা আমাদের ভয় পেত, তারা আমাদের ক্ষতি করতে
তৎপর হয়ে উঠে। ফলে বহু মুসলিম তথা দেশ দীর্ঘ সময় খৃষ্টানদের করতলগত হয়। তাতাদের দ্বারা পদানত হয়। তারপর আসে নাস্তিকদের
নাস্তিকতা, খৃষ্টানদের ও ইয়াহুদীদের চক্রান্ত যা আজকের মুসলিমদের দিকে তাকালে
স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়।
মতবিরোধ দূরীভূত করে কল্যাণ ফিরিয়ে আনার উপায়
এ ধরণের ভুল ভ্রান্তির ব্যাপারে বড় বড় ইসলামী চিন্তাবিদ সাবধান বাণী
উচ্চারণ করেছেন। ফলে প্রতিটি দেশ ও
যামানায় বহু ওলামাগণ সচেষ্ট হয়েছেন নিজেদের পারস্পরিক মতবিরোধ দূরীভূত করতে
এবং তাদের ঐ মূলের দিকে ফিরিয়ে আনতে, যার সাথে সম্পর্ক থাকা সকলের জন্যই অত্যন্ত
গর্বের বিষয়। তার উপর প্রতিটি মুসলিমই ভরসা করে। আর তা হল আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের
সুন্নাহ। এর মাধ্যমেই মুসলিমদের একতাবদ্ধ করা সম্ভব, সম্ভব পারস্পরিক মতবিরোধ
দূরীভূত করা এবং এবং নিজেদের মধ্যে বিরাজমান হিংসা বিদ্বেষ দূর করা।
প্রতিটি মুসলিমের উপর করণীয় ওয়াজিবগুলোর মধ্য একটি হলো- মুসলিমদের সাথে
বন্ধুত্ব করা, বিশেষ করে ওলামাদের সাথে। কারণ তারাই হচ্ছেন সালাফে সালেহীনদের
আদর্শ স্বরূপ এবং রাসূলদের খলীফা স্বরূপ। উম্মতের মশহুর ইমামগণের মধ্যে এমন কাউকে
পাওয়া যাবে না, যে বা যারা ইচ্ছাকৃতভাবে রাসূলের কোন সুন্নাহর বিরোধিতা করেছেন। এমনকি
কোন সাধারণ মুসলিমের জন্যও প্রকাশ্যভাবে
বিরোধিতা করা, অথবা তার সম্মান হানিকর কোন করা সম্ভব নয়। তারা সমস্টিগতভাবে একীন-ঈমানের
সাথে একমত যে, যে সমস্ত সহীহ হাদীসের বিপরীতে কোন সহীহ হাদিস নেই তার উপর আমল করা
ওয়াজিব। আর রাসূলের কথার উপর অন্য কারো
কোন কথাকে প্রাধান্য দেয়া কোন ভাবেই জায়েয
নেই ।
আলেমগণের সাথে সাধারণ মুসলিমের সম্পর্ক
কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লামের সাথে গভীর সম্পর্কের পর মুমিনদের বিশেষত: আলেমগণের প্রতি শ্রদ্ধা
প্রদর্শন করা মুসলিমদের অবশ্য করণীয়। কেননা আলেম সমাজ নবীকূলের উত্তরাধিকারী। আল্লাহ
যাদেরকে নক্ষত্রের ন্যায় উজ্জলতা ও নির্দিষ্ট অবস্থান দান করেছেন। তাদের দ্বারা জল-
স্থলের সমস্যার মধ্যে হিদায়েতের আলো প্রাপ্ত হওয়া যায়। ঐ সকল আলেমগণের হিদায়েতের
উপর পরিচালিত হওয়া এবং ধর্মীয় বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার ব্যাপারে মুসলিমগণ ঐক্যমত পোষণ
করেছেন। বস্তুত: আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের
পূর্বে প্রত্যেক জাতির আলেমগণই তাদের কাওমের মধ্যে নিকৃষ্ট ছিল। কিন্তু মুসলিম
জাতির আলেম সম্প্রদায় এ জাতির সর্বোৎকৃষ্ট অংশ। উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে তারাই
রাসূলের প্রতিনিধি এবং তার সুন্নাতের পুনর্জীবন দানকারী। তাদের প্রচেষ্টায়ই কুরআন
মজীদ সুপ্রতিষ্ঠিত অবস্থায় আছে এবং কুরআনের কারণেই তারাও দ্বীনের উপর কায়েম
আছেন।
কোন ইমাম ইচ্ছাকৃতভাবে রাসূলের সুন্নাতের খেলাফ করেননি
স্মরণযোগ্য যে, সর্বজনস্বীকৃত কোন ইমাম, রাসূলের সুন্নতের; তা ছোট হোক বা
বড় হোক, বিপরীত আমল করেননি। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী ছাড়া
অন্য যে কোন লোকের বাণী গ্রহণও করা যেতে পারে আবার প্রত্যাখ্যান ও করা যেতে পারে। অর্থাৎ
যদি তাদের কথা শুদ্ধ হয়, তবে তা গৃহীত হবে। আর যদি ভুল হয় তবে তা প্রত্যাখ্যাত
হবে। কখনও উম্মতের আলেমগণের কোন মত হাদীসের বিপরীত দেখা গেলে তিনি হাদীস বর্জনের
কোন না কোন কারণ থাকতে হবে।
এই ধরণের কারণ তিন প্রকার:
প্রথমত: তিনি এই হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের
বলে বিশ্বাস না করা।
দ্বিতীয়ত: এই হাদীস দ্বারা উক্ত মাসআলা প্রতিষ্ঠা উদ্দেশ্য বলে মনে না করা।
তৃতীয়ত: এই হাদীস মনসুখ বা রহিত
হয়ে গেছে বলে দৃঢ় বিশ্বাস করা।
প্রথম কারণ: হয়ত
হাদীসটি তার নিকট পৌছেনি। আর যার নিকট হাদীস পৌছেনি, উক্ত হাদীসের বিষয়বস্তু
সম্পর্কেও জ্ঞাত হওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তার নিকট ঐ হাদীস না পৌছার কারণে কোন
বিষয়ে স্পষ্ট আয়াত কিংবা অন্য হাদীস অথবা কিয়াসের নিয়ম বা ইসতেসহাবের দ্বারা তিনি রায়
প্রদান করলে, তা কখনও ঐ হাদীসের অনুকূলে হয় আবার কখনও তার প্রতিকূলে হয়। সালাফে সালেহীনদের কোন কোন মত হাদীসের বিপরীত
হওয়ার জন্য উপরোক্ত কারণটি সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য।
উম্মতের কোন এক ব্যক্তির পক্ষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের
সমস্ত হাদীস পূর্ণরূপে আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
যখন কোন হাদীস বর্ণনা করতেন, বিচার করতেন, কোন বিষয়ে ফতোয়া দিতেন অথবা কোন কাজ
করতেন, তখন উপস্থিত লোকগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী শ্রবণ
করতেন কিংবা অবলোকন করতেন। অত:পর উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের প্রত্যেকেই কিংবা কেউ কেউ
শ্রুত বা পরিদৃষ্ট হাদীসটি অপরের নিকট পৌছাতেন। তারপর উক্ত হাদীসটি বিজ্ঞ সাহাবা,
তাবেয়ীন ও তাদের পরবর্তীগণের মধ্যে যাদের কাছে আল্লাহপাক ইচ্ছা করতেন তাদের কাছে
পৌছাতেন।
এর পর অন্য একটি মজলিসে হাদীস বর্ণিত হতো, সিদ্ধান্ত হতো, বিচার করা হতো
অথবা কোন কাজ করা হতো। যারা পূর্বের
মজলিসে অনুপস্থিত ছিলেন, তাদের কেউ কেউ পরবর্তী মজলিসে উপস্থিত থাকতেন। যাদের
পক্ষে সম্ভব হতো তারা শ্রুত হাদীসটি প্রচার করতেন। অতএব, পূর্বের মজলিসে উপস্থিত লোকদের যে জ্ঞান
লাভ হয়েছে, তা পরবর্তী মজলিসে উপস্থিত লোকদের হয়নি। আবার পরবর্তী মজলিসের লোকদের
যে জ্ঞান লাভ হয়েছে তা পূর্ববর্তী লোকদের হয়নি। বিজ্ঞ সাহাবাগণের মর্যাদার তারতম্য
তাদের পরবর্তীগণের পরস্পরের প্রাধান্য নির্ভর করে তাদের জ্ঞানের গভীরতা, ব্যাপকতা
ও উৎকর্ষের উপর। একজনের পক্ষে রাসূলের সম্পূর্ণ হাদীস আয়ত্ব করা সম্ভব এরূপ দাবী
করা বাতুলতা মাত্র। এ ব্যাপারে খুলাফায়ে রাশেদীন আদশের্র প্রতীক। কেননা তারা রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা-বার্তা, নিয়ম- পদ্ধতি ও চলা-ফেরা ইত্যাদি
অবস্থা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জ্ঞাত। বিশেষত: আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু
দেশে বিদেশে কখনও রাসূলের সঙ্গ ত্যাগ করেননি। বরং সব সময় রাসূলের সংগে থাকতেন।
এমনকি মুসলিম জাতির প্রয়োজনে রাসূলের নিকট তিনি বিনিদ্র রাত্রি যাপন করতেন। উমর রাদিয়াল্লাহু
আনহু ছিলেন অনুরূপ। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায় বলতেন:
دَخَلْتُ
أنَا وَأبُوْبَكْرٍ وَعُمَرُ وَخَرَجْتُ أنَا وَأبُوْبَكْرٍ وَعُمَرُ . رواه
البخاري
আমি আবুবকর ও
উমর প্রবেশ করেছি এবং আমি, আবুবকর ও উমর বের হয়েছি। (বর্ণনায়: বুখারী)
কয়েক জন বিখ্যাত
ব্যক্তি যারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হওয়ার পরও সব জানতেন না। এবং সব জানার দাবী
করতেন না। এবং সহীহ হাদীস জানার পর তাদের নিজস্ব মত ত্যাগ করে হাদীসের অনুসরণ
করেছেন।
স্বঅভিমত ত্যাগ
করে হাদীসের অনুসরণের উজ্জল দৃষ্টান্ত যুগে যুগে
আবু বকর রা.
এতদসত্ত্বেও
যখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দাদীর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য সম্পত্তি
সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল, তখন তিনি বললেন :
مالكَِ في كتاب الله من شيء وما علمت لكِ في سنة رسول
الله صلى الله عليه وسلم من شيئ، ولكن حتى أسأل الناس
তোমার জন্য
আল্লাহর কুরআনে অংশ নির্ধারিত নেই এবং হাদিসেও তদ্রুপ কোন নির্দেশ আমার জানা নেই। তবে আমি লোকদেরকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করব।
লোকদিগকে জিজ্ঞেস করা হলে মুগীরা বিন শোবা রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং মুহাম্মদ বিন মাসলামা রাদিয়াল্লাহু দাড়িয়ে
সাক্ষ্য দিলেন যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাদীকে পরিত্যক্ত
সম্পত্তির ষষ্ঠাংশ দিয়েছেন। ইমরান ইবনে হোসাইন এই হাদীসটি পৌছিয়েছেন। (বর্ণনায়: আবু
দাউদ, তিরমিজী)
উপরোক্ত তিনজন
সাহাবী আবু বকর রা. কিংবা খলীফা চতুষ্টয়ের অন্যান্যদের সমকক্ষ নন। তথাপি এ হাদীসটি
সম্পর্কীয় জ্ঞানের ব্যাপারে তাদেরকে বিশেষত্ব দেয়া হয়েছে এবং এ রায় গ্রহণের
ব্যাপারে সমস্ত উম্মত একমত।
উমর রা.
অনুমতি
প্রার্থণার হাদীস তার জানা ছিল না। এ সম্পর্কে তাকে আবু মুসা আল আশআরী জানানোর পর
অবগত হন। এবং সত্যায়নের জন্য সাক্ষীও তিনি
তলব করেছেন। (বর্ণনায়: বুখারী)
স্ত্রী স্বামীর
দিয়তে (জরিমানা স্বরূপ প্রাপ্ত সম্পদ) অংশীদারী হবে কিনা এ বিষয়ে উমর রাদিয়াল্লাহু
আনহু জ্ঞাত ছিলেন না। বরং তার ধারণা ছিল দিয়ত অভিভাবকের প্রাপ্য। দাহহাক বিন
সুফইয়ান আল কালাবী- যিনি রাসূলের সময় কোন গ্রাম্য এলাকায় আমীর ছিলেন, উমর রা.কে এ
সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লামের হাদীস জানালেন যে, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশইয়াম আদদিবাবী রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রীকে স্বামীর দিয়তের অংশীদার করেছেন। অত:পর
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার মত পরিবর্তন করলেন । এবং বললেন, যদি আমরা এই হাদীস না
শুনতাম তবে এর খেলাফ করতাম। (বর্ণনায়: মসনাদে আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযী)
উমর রা. অগ্নি
পূজকদের নিকট থেকে জিযয়া কর আদায় করা হবে কিনা এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না। অত:পর
আব্দুর রহমান বিন আওফ রাহ. তাকে রাসূলের হাদিস শুনালেন। রাসূল সা. বলেছেন:
سَنُّوْابِهِمْ
سُنَّةَ أهْلِ الْكِتَابِ رواه البخاري
তোমরা তাদের
সাথে জিযয়ার ব্যাপারে আহলে কিতাবের ন্যায় আচরণ কর।
উমর রা.
সারগা-তাবুক উপত্যকার একটি গ্রামের নাম। স্থানে পৌছলেন, তখন খবর পেলেন যে, শাম
দেশে সিরিয়া ও তৎসংলগ্ন এলাকা) প্লেগের প্রাদুর্ভব দেখা দিয়েছে। এমতাবস্থায়, তিনি
তার সাথে থাকা মুহাজিরীনে আউয়ালিনের নিকট পরামর্শ চাইলেন। তৎপর আনসারদের কাছে
পরামর্শ চাইলেন। তৎপর মক্কাবিজয়ের সময়ের মুসলিমদের মতামত চাইলেন। তারা সকলেই নিজ
নিজ অভিমত পেশ করলেন। কেউই এ সম্পর্কে হাদীস বলতে পারলেন না। এ সময় আব্দুর রহমান
বিন আওফ রা. আগমন করলেন এবং মহামারী সংক্রান্ত হাদিসটি বর্ণনা করলেন।
রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إذَا وَقَعَ بِاَرْضٍ وَأنْتُمْ بِهَا فَلَا تَخْرُجُوْا
فِرَاراً مِنْهُ وَاِذَا سَمِعْتُمْ بِهِ بِاَرْضٍ فَلَاتُقَدِّمُوْا عَلَيْهِ.
رواه مسلم والبخاري
তোমরা অবস্থানকালীন কোন স্থানে মহামারী দেখা দিলে তোমরা ঐ জায়গা হতে পালিয়ে
যেও না এবং কোন স্থানে মহামারী প্রাদুর্ভাবের কথা শুনলে সেখানে তোমরা প্রবেশ করবে
না।
উমর ও আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রা. সালাতে সন্দেহ পোষণকারী ব্যক্তির বিধান সম্পর্কে
আলোচনা করেন। এ সম্পর্কে উমর রা. নিকট পূর্বে কোন সহীহ হাদিস পৌঁছেনি। তখন আব্দুর
রহমান বিন আউফ রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদিসটি শুনালেন:
اِنَّهُ يَطْرَحُ الشَّكَّ وَيُبْنِيْ عَلَى مَا اسْتَيْقَنَ. أحمد ومسلم وابوداود
والترمذي
‘সে সন্দেহ ছেড়ে ইয়াকীনের আমল
করবে।
একদা সফরকালে উমর রা. ভীষণ ঝড়ের সম্মুখীন হলেন এবং বলতে লাগলেন, কে
আমাদেরকে ঝড় সম্পর্কীয় হাদীস শুনাবে? তখন আবু হুরায়রা রা. বললেন, যখন আমার নিকট
উমরের কথাটি পৌছল তখন আমি দলের পশ্চাতে ছিলাম। অত:পর আমি আমার বাহনকে তাড়াতাড়ি
চালালাম এবং উমরের নিকট পৌছলাম। অত:পর ঝড় প্রবাহের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম নির্দেশিত হাদীস তার নিকট বর্ণনা করলাম।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
اَلرِّيْحُ مِنْ رُوحِ اللهِ تَأتِيْ بِالرَّحْمَةِ
وَتَأتِيْ بِالْعَذَابِ فَاِذَارَأيْتُمُوْهَا فَلَا تَسُبُّوْهَا وَاسْئلُوْاللهَ
خَيْرَهَا وَاسْتَعِيْذُوْابِاللهِ مِنْ شَرِّهَا. رواه مسلم
ঝড় আল্লাহার পক্ষ হতে প্রবাহিত হয়ে থাকে উহা কখনও রহমত বহন করে আবার কখনও
আযাব বহন করে। অতএব, যখন তোমরা ঝড় প্রবাহিত হতে দেখ তখন তাকে গালি দিও না বরং
আল্লাহর নিকট মঙ্গল কামনা কর এবং অমঙ্গল হতে পরিত্রাণ লাভের প্রার্থনা কর। (বর্ণনায়:
মুসলিম)
এ মাসআলাগুলো সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না। কিন্তু উহা তার নিকট এমন লোকেরা
পৌছালেন যারা তার সমকক্ষ নয়। এর পরও তিনি তা গ্রহণ করেছেন।
আরও কতকগুলি এমন মাসআলা আছে যেগুলো সম্পর্কে তার নিকট হাদীস এবং সে বিষয়ে হাদীস ব্যতিরেকেই বিচার করেছেন অথবা
ফতোয়া দিয়েছেন। তার উদাহরণ নিম্নে তুলে ধরা হলো।
তিনি হাতের অঙ্গুলির দিয়ত (জরিমানা) সম্পর্কে ফতোয়া দিয়েছেন যে, সকল
অঙ্গুলির দিয়ত সমান নয়। বরং অঙ্গুলির উপকারিতার তারতম্য অনুসারে তার দিয়তও কম বেশী
হয়ে থাকে। কিন্তু আবু মুসা ও ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা তার তুলনায় জ্ঞানের দিক
দিয়ে কম হওয়া সত্ত্বেও এ হাদীস সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন, তাদের জানা ছিল যে
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
هَذِهِ وَهَذِهِ سَوَاءُ رواه البخاري
বৃদ্ধাঙ্গুলী ও অনামিকার দিয়ত সমান সমান
মুয়াবিয়ার রা. শাসনামলে এ হাদীসটি তার নিকট পৌছলে তিনি সে অনুসারে রায়
প্রদান করেন। মুসলিমদের এর অনুসরণ করা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। উমরের নিকট উক্ত হাদীস
না পৌছা তার জন্য ঐ ফতোয়া দোষণীয় ছিল না।
এমনিভাবে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুহরিম ব্যক্তিকে হজ ও উমরার এহরামের
পূর্বে এবং জামরাতুল আকাবায়ে শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ করার পর মক্কায় তাওয়াফে ইফাদার
(হজের ফরজ তাওয়াফ) পূর্বে সুগন্ধি ব্যবহার করতে নিষেধ করতেন। তিনি এবং তার পুত্র
আব্দুল্লাহ এবং অন্যান্য মর্যাদাবান সাহাবাগণ এই আদেশ করতেন। তাদের নিকট আয়েশা
রাদিয়াল্লাহু আনহার হাদীসটি পৌঁছেনি।
طيبت رسولَ الله صلى الله عليه وسلم لاِحرامه قبل أن
يحرم ولحله قبل أن يطوف. البخاري ومسلم
আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উমরাহর জন্য এহরাম বাধার
পূর্বে এবং হালালের জন্য (এহরাম খোলা) তওয়াফের পূর্বে সুগন্ধি লাগিয়ে দিতাম। (বুখারী,
মুসলিম)
উমর রা. চামড়ার মোজা না খোলা পর্যন্ত অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য মোজা
পরিধানকারীকে মোজার উপর মাসেহ করার হুকুম দিতেন। সালাফে সালেহীনের একদল এইমত
অনুসরণ করেন। তাদের নিকট মোজার উপরে মাসেহর সময় নির্ধারণ সংক্রান্ত হাদীস পৌছেনি। পক্ষান্তরে,
এমন কতিপয় লোকের নিকট সহীহ হাদীস পৌছেছিল যারা জ্ঞানের দিক দিয়ে তাদের সমকক্ষ
ছিলেন না। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে সঠিকভাবে বিভিন্ন পন্থায় হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
(বর্ণনায়: মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী)
উসমান রা.
উসমান রা. বিধবার নিজ ঘরে ইদ্দত পালন করা সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন না। আবু
সাইদ খুদরীর বোন ফুরাইয়া বিনতে মালেক রা. যার স্বামী ইন্তেকাল করেছেন, এ সম্পর্কীয় হাদীস শুনালেন যে, যখন ফুরাইয়ার স্বামী ইন্তেকাল
করলেন তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন:
اُمكثيْ في بيتكَ حتى يبلغ الكتابُ أجَلَهُ. رواه
ابوداود الترمذي
ইদ্দত পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তুমি নিজ
ঘরেই অবস্থান কর।
অত:পর উসমান রা. এ হাদীস গ্রহণ করলেন।
একদা মুহরিম আবস্থায় শিকারকৃত পশু
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে কে হাদিয়া দেয়া হল এবং জন্তুটি তার জন্যই শিকার করা
হয়েছিল, তিনি ওটা খাবার ইচ্ছা করেছিলেন। এমন সময় আলী রা. হাদীস শুনালেন যে, ইহরাম আবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লামকে শিকারকৃত গোশত হাদিয়া দেয়া হলে তিনি তা ফেরৎ দিয়েছিলেন। (বর্ণনায়: মুসনাদে
আহমাদ)
আলী রা.
আলী রা. বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে যখন কোন
হাদীস শুনতাম, তা দ্বারা আল্লাহ তার ইচ্ছামত আমাকে উপকৃত করতেন। পক্ষান্তরে রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া অন্য কেউ আমার নিকট হাদীস বর্ণনা করলে আমি
তার নিকট হতে শপথ নিতাম। শপথ করার পর আমি তার বণির্ত হাদীস বিশ্বাস করতাম। আর
আবুবকর রা. আমার নিকট তওবার সালাতের হাদিস বর্ণনা করেছেন। এবং তিনি সঠিক বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَامِنْ رَجُلٍ يَذْنِبُ ذَنْبَاً فَيَتَوَضَّأُ
فَيُحْسِنُ الْوَضُوْءَ ثُمَّ يُصَلِّي ركَعتينِ ........
যে ব্যক্তি কোন গুনাহ করে,
তারপর ভালভাবে উযু করে দুইরাকাত সালাত আদায় করে এবং আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে, তখন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। অত:পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
উল্লেখিত আয়াতটি পাঠ করেন যাতে আল্লাহ বলেন: যারা কোন অশ্লীল অথবা অন্যায় কাজ করে
অথবা নফসের উপর অত্যাচার করে, তৎপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে। (আলে ইমরান,
আয়াত ১৩৫) আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজা প্রভৃতি।
আলী ও ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা গর্ভবতী বিধবা স্ত্রীলোকের দুই নির্ধারিত
ইদ্দতের সময়ের ( সন্তান প্রসবের ইদ্দত এবং স্বামীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বার বিয়ের
জন্য যে ইদ্দত ) দীর্ঘতম ইদ্দত পালন করার ফতোয়া প্রদান করতেন। শুবিয়াহ আল আসলামি
সম্পর্কে বর্ণিত রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসটি তার নিকট
পৌছেনি। শুবিয়াহ আল আসলামী গর্ভাবস্থায়
তার স্বামী সাদ বিন খাওলা - এর মৃত্যু হলে রাসূল সা. তার জন্য সন্তান প্রসব
পর্যন্ত ইদ্দতের সময় নির্ধারণ করেছিলেন। (বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ)
আলী, জায়েদ বিন ছাবেত, ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুম সহ আরো অনেকেই মোহর নির্ধারণ ব্যতিরেকেই বিয়ে হওয়া
স্ত্রীলোকের স্বামী মারা গেলে এ ফতোয়া দিতেন যে, তার মোহর দিতে হবে না। কেননা
তাদের নিকট বারওয়া বিনতে ওয়াশেক সম্পর্কের হাদিসটি পৌছেনি। (আহমদ, তিরমিযী)
এ এক অধ্যায়। সাহাবাগণ হতে বর্ণিত এরূপ ঘটনার সংখ্যা অগণিত।
কিন্তু সাহাবাগণ ব্যতীত অন্যান্যদের হতে বর্ণিত সংখ্যাও হাজার হাজার, যা
সংখ্যায়িত করা সম্ভব নয়।
উল্লেখিত সাহাবাগণ উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে বেশী অভিজ্ঞ, বুদ্ধিমান, জ্ঞানী,
উত্তম ও আল্লাহভীরু। তাদের পরবর্তীগণ এ
সকল গুণাবলী হতে আনুপাতিক হারে অপূর্ণ। সুতারাং তাদের নিকট রাসূলের সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন কোন হাদীস অজানা বা অস্পষ্ট থাকা কিছুমাত্র বিচিত্র নয়
এবং এ ব্যাপারে বিস্তারিত বর্ণনার প্রয়োজন নেই।
সব হাদীস না জানা এবং হাদীসের বিপরীত আমলের কারণ
যারা ধারণা করে যে, প্রত্যেক ইমাম অথবা কোন নির্দিষ্ট ইমামের নিকট রাসূলের
প্রত্যেকটি সহীহ হাদিস পৌছেছে, তারা অজ্ঞ বৈ কিছু নয়।
কেউ যেন কখনও এ কথা না বলেন যে, হাদীসসমূহের একত্রিকরণ ও সংকলনের পর
সেগুলির অস্পষ্টতা বা অজানা জ্ঞানবর্হিভূত। কেননা, সুনানগুলি হাদীস একত্রিত হওয়ার
প্রসিদ্ধ সংকলন। এগুলি স্বীকৃত ইমামদের তিরোধানের পরই সংকলিত হয়েছে। এতদসত্ত্বেও
রাসূলের হাদীসকে নির্দিষ্ট সংকলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ দাবী করা বৈধ নয়। যদিও ধরে নেয়া যায় যে, হাদীস
সংকলিত কেতাবের মধ্যে সীমিত, তবুও ঐ কথা
বলা যায় না যে, একজন আলেম কিতাবের সমূদয় ইমল সম্পর্কে জ্ঞাত। আর করো পক্ষে এরূপ
বিদ্যার্জন সম্পূর্ণ অসম্ভব; বরং কখনও এরূপ হয়ে থাকে যে, একজন লোকের নিকট অনেক
অনেক সংকলন আছে, অথচ সংকলিত বস্তু তার পূর্ণ আয়ত্বে নেই। বরং হাদীস শাস্ত্রের এরূপ
সংকলনের সময়কালের পূর্বের লোকেরা পরবর্তী লোকদের থেকে হাদীস শাস্ত্র বেশী জ্ঞাত
ছিলেন। কেননা, তাদের নিকট যেগুলি সহীহ ও
সঠিকভাবে পৌছেছে, এমন অনকেগুলি আমাদের নিকট অজানার দরুণ কিংবা সনদের বিচ্ছিন্নতার
কারণে পৌছেনি, কিংবা হাদীসটি অদৌ পৌছেনি।
তাদের বক্ষ ছিল সংকলিত গ্রন্থ স্বরূপ। কেননা, তাদের বক্ষ ঐ সকল গ্রন্থরাজি
হতেও অধিক ধারণ করত। এ বিষয়ে পণ্ডিত
ব্যক্তিরা সন্দেহ করেন না।
এবং এ কথা বলা উচিৎ নয় যে, যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ হাদীস সম্পর্কে জ্ঞাত
নয়, সে মুজতাহিদ হতে পারবে না। কেননা, মুজতাহিদ হওয়ার জন্য যদি এ শর্ত করা হয় যে, তাকে আহকাম
সম্পর্কিত রাসূলের সমূদয় হাদীস জানতে হবে,
তাহলে উম্মতের মাঝে কোন মুজতাহিদ পাওয়া যাবে না। তবে একজন আলেমের জন্য এটা
যথেষ্ট যে, সে এর অধিকাংশ বিষয়বস্তু ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত।
বিস্তারিত বিষয়ের অংশ বিশেষ ছাড়া সবই তার কাছে স্পষ্ট। অধিকন্তু অল্প কিছু যা তার
অজানা। কখনও তার নিকট বিস্তারিত হাদীস পৌছানো হলে তার অল্পটি হাদীসের বিপরীত হয়ে থাকে।
দ্বিতীয় কারণ:
এই যে, হাদীসটি তার নিকট পৌছেছে,
কিন্তু হাদীসটি কোন কারণে তার নিকট নির্ভরযোগ্য নয়।
কারণগুলো হল:
হাদীস তার কাছে বর্ণনাকারী কিংবা বর্ণনাকারীর কাছে বর্ণনাকারী অথবা সনদের
অন্য কোন ব্যক্তি তার কাছে অজ্ঞাত, কিংবা
কোন অভিযোগে অভিযুক্ত, অথবা স্মৃতি শক্তিতে দুর্বল, অথবা হাদীসটি তার নিকট মারফু
অবস্থায় পৌছেনি, বরং মুনকাতে অবস্থায় পৌছেছে। কিংবা হাদীসের শব্দগুলি দৃঢ়তার সাথে
ব্যক্ত হয়নি।
পক্ষান্তরে ঐ হাদীসটি অপর একজনের নিকট নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী দ্বারা
মুত্তাসিল সনদে পৌছেছে এবং অজ্ঞাত বর্ণনাকারী তার নিকট নির্ভরযোগ্য। অথবা এরূপ ও
হয়ে থাকে যে, ঐ হাদীসটি অন্য সনদে বর্ণিত, যার বর্ণনাকারী কোন অভিযোগে অভিযুক্ত নয়
এবং সনদটি ও মুনকাতি বা বিচ্ছিন্ন নয় বরং মুত্তাসিল। এতদসত্ত্বেও হাদীস শাস্ত্রের
কতিপয় হাফেজ, হাদীসের শব্দগুলি দৃঢ়তার সাথে বর্ণনা করেছেন অথবা ঐ হাদীসটির জন্য
এমন কতকগুলি মুতাবায়াত ও শাওয়াহিদ রয়েছে যার দ্বারা উক্ত হাদীসটি শুদ্ধ প্রমাণিত
হয়।
এ জাতীয় হাদীস তাবেয়ীন ও তবে তাবেয়ীন হতে আরম্ভ করে প্রসিদ্ধ ইমামগণের
মধ্যে বহুল প্রকারে পাওয়া যায় এবং এ সকল হাদীসের সংখ্যা প্রথম যুগের চেয়ে বেশী
অথবা প্রথম প্রকার হতে অধিকতর বেশী। কেননা, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে হাদীস প্রচার ও
প্রসার লাভ করেছিল, তাতে এমনও বহু হাদীস ছিল যা বহু আলেমের নিকট দুর্বল পন্থায়
পৌছে। সুতরাং এ পর্যায়ে অত্র হাদীসগুলি দলিল হতে পারে, যদিও বিপক্ষীয়দের নিকট এই
পন্থায় না পৌছে থাকে।
এ জন্য বহু ইমাম তাদের রায় প্রদানের সময় বিশুদ্ধ হাদীসের উপর নির্ভর করে
কথা বলেন। তারা বলে থাকেন অমুক মাসআলায় আমার রায় হচ্ছে এই, কেননা এ সম্পর্কে অমুক
হাদীস বর্ণিত আছে। যদি হাদীসটি সহীহ হয়, তবে উহাই আমার রায়
তৃতীয় কারণ:
ইজতেহাদ মোতাবেক কোন হাদীসকে দুর্বল মনে করা। যদিও অন্যান্য আলেমগণ উহাকে
দুর্বল হিসোবে আখ্যায়িত করেন না। হতে পারে তিনি সঠিক অথবা তারা উভয়ে সঠিক। এটা এ
কথার উপর ভিত্তি করে যে
كل مجتهد مصيب
অর্থাৎ প্রত্যেক মুজতাহিদ তার ইজতেহাদে নির্ভূল।
এর কতগুলো কারণ রয়েছে
প্রথম: হাদীস
বর্ণনাকারী কারও মতে দুর্বল, কিন্তু অন্য ইমামের মতে নির্ভরযোগ্য। আর معرفة الرجال বা বর্ণনাকারীদের পরিচয় লাভ একটি ব্যাপক বিদ্যা।
অত:পর যে ইমাম হাদীসের বর্ণনাকারীকে দুর্বল মনে করে, কখনও কখনও তার কথা
সঠিক হয়ে থাকে। কেননা, তার জানা আছে যে, এ হাদীসের বর্ণনাকারী কোন অভিযোগে
অভিযুক্ত। আবার কখনও অন্য ইমাম হাদীস বর্ণনাকরীকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন। তার কথাও
সঠিক হয়ে থাকে। কেননা, যে কারণে তাকে
দুর্বল বা দোষণীয় মনে করা হয়েছে, সেই কারণটি দোষণীয় নয়। ফলে হাদীসটিকেও দুর্বল
বলা চলবে না। অথবা সে এমন ওযরের সম্মুখীন যে তাকে দোষ দেয়া যায় না, যার জন্য হাদীসটি
দুর্বল বলা চলে। এটাও একটি বিরাট অধ্যায়। হাদিস
শাস্ত্রে أسماء الرجال বর্ণনাকারীদের পরিচয়ের বিষয়ে এমন মতৈক্য ও মতভেদ রয়েছে, যেমন ভাবে আলেমগণের
মধ্যে অন্যান্য বিষয়ে হয়ে থাকে।
দ্বিতীয়: মুহাদ্দিস
শ্রুত হাদীস, বর্ণনাকারী হতে শুনেছেন বলে বিশ্বাস না করা অর্থাৎ হাদীস বর্ণনাকারী
হাদীসটি তার বর্ণনাকারী হতে শুনেছেন বলে অবিশ্বাস করা। অপর পক্ষে অন্যরা মনে করেন
যে, ঐ মুহাদ্দিস বর্ণনাকারী হতে শুনেছেন। কেননা, তাদের নিকট এমন কতিপয় দলিল আছে,
যা দ্বারা তা শুনেছেন বলে প্রমাণ হয়।
তৃতীয়: মুহাদ্দেসগণের দুই অবস্থা হয়ে থাকে ক. দ্বীনের
উপর দৃঢ়তা ও খ. দুর্বলতা। যেমন বার্ধক্যজনিত কারণ ইত্যাদির জন্য জ্ঞান লোপ পাওয়া
অথবা তার পুস্তক পুড়ে নষ্ট হওয়া। সুতরাং যা সে স্থির অবস্থায় বর্ণনা করেছে, তা
সহীহ গ্রহণযোগ্য। আবার যা অস্থির অবস্থায়
বর্ণনা করেছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং বর্ণিত হাদীসটি কোন অবস্থায় বর্ণিত হয়েছে
তা অজানা, কিন্তু কোন কোন মুহাদ্দিস বর্ণনাকালীন অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত সুতারাং
সেই হাদীসটি সহীহ বলে ঘোষণা করে থাকেন।
৪. বর্ণিত হাদীসটি মুহাদ্দিস ভুলে গিয়েছেন। তৎপর তিনি তা স্মরণ করতে
পারেননি। অথবা তিনি উক্ত হাদীস বর্ণনা করেছেন বলে অস্বীকার করেন। সুতরাং কোন ইমাম
ঐ হাদিস এজন্য আমল করেননি যেহেতু তার বর্ণনাকারী ঐ হাদীসের বর্ণনা অস্বীকার করেন।
অপর পক্ষে অন্য একজন মুহাদ্দিসের মতে হাদীসটি দলিল হিসাবে গ্রহণের উপযোগী। এই
মাসআলাটি অনেকের নিকট জ্ঞাত।
৫. হাদীস আমল না করার কারণ এও হয়ে থাকে যে, বহু সংখ্যক হেজাযী
মুহাদ্দিসীনের মতে ইরাকী ও শামীদের (সিরীয়) বর্ণিত হাদীস দলিল হিসাবে গ্রহণযোগ্য
নয়, যখন পর্যন্ত ঐ হাদীসের মূল হেজাযে বিদ্যমান না থাকে। এমনকি কেউ বলেছেন ইরাকবাসীদের
বর্ণিত হাদীস আহলে কিতাব এর বর্ণিত হাদিসের সমপর্যায়ভুক্ত। তাকে বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস কোনটাই করায় যায়
না।
আরো বর্ণিত আছে কোন মুহাদ্দিসকে প্রশ্ন করা হল - সুফিয়ান মনসুর হতে মনসুর
ইব্রাহিম হতে ইব্রাহিম আলকামা হতে, আলাকামা আবদুল্লাহ বিন মাসউদ হতে বর্ণিত সনদ গ্রহণযোগ্য কিনা? তদুত্তরে তিনি
বলেন, হিজাযে তার আমলে মওজুদ না থাকলে উহা দলিল হতে পারে না। এর কারণ এই যে, তারা
মনে করেন যে হিজাযাবাসীরা দৃঢ়ভাবে হাদীস সংরক্ষণ করেছেন। এবং কোন হাদীসই তাদের
সংরক্ষণ হতে পরিত্যক্ত হয়নি। পক্ষান্তরে ইরাকীবাসীদের হাদীসের মধ্যে
اضطراب তখা অস্থিরতা বিদ্যমান। সুতরাং এগুলি সম্পর্কে মৌনতা অবলম্বন করা উচিৎ। কোন কোন ইরাকবাসীর অভিমত হলো সিরীয়দের বর্ণিত
হাদীস দলিল হতে পারে না। যদি ও অধিকাংশ লোক এরূপ হাদীসকে দুর্বল হাদিস হিসাবে গন্য
করারে পরিত্যাগ করেছেন।
হাদীস ইরাক সিরীয়া হিজায কিংবা অন্য যে কোন দেশীয় হোক না কেন, সনদ ঠিক হলে
ঐ হাদীস দলিল হবে।
আবু দাউদ আসসিজিসতানি তার সুনানে শহরবাসীদের গুরুত্ব ও বিশেষত্ব সম্পর্কে
একটি অধ্যায় প্রণয়ন করেছেন। উক্ত অধ্যায়ে তিনি সুনানে বর্ণিত প্রত্যেক শহরের অধিবাসীকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করেছেন।
সেই শহরগুলি হল মদিনা মক্কা, তায়েফ দামেস্ক, হেমস কুফা, বসরা ইত্যাদি। হাদীস আমল
না করার উপরোক্ত কারণ ছাড়াও আরো কতকগুলি কারণ রয়েছে।
চতুর্থ কারণ:
ক. কেউ বলেন, বর্ণনাকারীকে ন্যায় পরায়ণ ও তীক্ষ্ণ স্মরণশক্তির অধিকারী হতে
হবে।
খ. আবার কেউ বলেন, বর্ণনাকারী ফকীহ হওয়া শর্ত, যখন ঐ হাদীস কিয়াসের খেলাফ
হবে।
গ. আবার কেউ কেউ বলেন খবরে ওয়াহেদ গ্রহণের শর্ত, যখন তা মানুষের মধ্যে
ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে ঐ হাদীস যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কিত হয়ে থাকে।
এভাবে বিভিন্ন জন বিভিন্ন শর্ত আরোপ করেন। যথাস্থানে এ সম্বন্ধে বিষেশভাবে উল্লেখ
করা হবে।
পঞ্চম কারণ:
হাদীসটি ইমামের নিকট পৌছে এবং তার নিকট গ্রহণীয় হয়েছে, কিন্তু তিনি ভুলে
গেছেন। এর উদাহরণ কুরআন ও হাদীসে বহু আছে। যেমন উমর হতে বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদীস।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে প্রশ্ন করা হলো সফরের সময় কোন ব্যক্তি নাপাক হলে এবং তখন
পানি না পাওয়া গেলে সালাত আদায় করতে হবে কি না? উত্তরে তিনি বলেন, সফরের সময় কোন
ব্যক্তি নাপাক হলে পানি না পাওয়া পর্যন্ত তাকে সালাত আদায় করতে হবে না। তখন আম্মার
ইবনে ইয়াসার রা. বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন আপনার কি সেই কথা স্মরণ আছে, যখন আপনি ও
আমি উটের দলের মধ্যে ছিলাম এবং আমরা নাপাক হয়েছিলাম। অত:পর আমি পশুর মত মাটিতে
গড়াগড়ি দিয়ে উঠলাম এবং সালাত আদায় করলাম। কিন্তু আপনি সালাত আদায় করলেন না তারপর এ
ঘটনা রাসূলের নিকট ব্যক্ত করলাম। তখন তিনি বললেন- তোমার জন্য এভাবেই করা যথেষ্ট
হতো বলে রাসূল দুই হাত মাটি স্পর্শ করলেন। অত:পর দুহাত দিয়ে মুখমণ্ডল ও কব্জিদ্বয়
মাসেহ করলেন। তখন উমর রা. বললেন, হে আম্মার আল্লাহকে ভয় করুন! যেভাবে আল্লাহকে ভয়
করা দরকার। আম্মার বললেন যদি আপনি ইচ্ছা করেন তবে আমি এটা বর্ণনা করব না। তদুত্তরে
উমর রা. বললেন আপনাকে যে বিষয়ে হাদীস বর্ণনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আমরাও সে বিষয়ে
অনুমোদন দিচ্ছি। (বুখারী, মুসলিম)
এ হাদীসটি উমর জানতেন পরে তিনি হাদীসটি এমনভাবে ভুলে যান যে, তার বিপরীত
রায় প্রকাশ করেন এবং আম্মার রা. তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়া সত্ত্বেও তিনি স্মরণ করতে
পারেননি। তিনি আম্মারকে মিথ্যুক বলেননি, বরং হাদিসটি বর্ণনা করার আদেশ দেন।
উপরোক্ত ঘটনা এটা আরো ব্যাপক হলো যে একবার উমর রা. খুৎবায় বললেন : রাসূলের
স্ত্রীদের ও মেয়েদের মোহর হতে যে কোন ব্যক্তির অতিরিক্ত মোহর আমি রদ করবো। তখন একজন স্ত্রীলোক বললেন হে উমর! আল্লাহ স্বয়ং
যা আমাদেরকে দান করেছেন তা হতে আপনি কেমন করে বঞ্চিত করবেন? অত:পর দলিল হিসাবে এই
আয়াত পাঠ করলেন-
وَأتَيْتُمْ إحْدَاهُنَّ قِنْطَاراً فَلَاتَأخُذُوْا
مِنْهُ شَيْئاً . سورة النساء 20
তোমরা স্ত্রীদের কাউকেও প্রচুর
পরিমানণ মোহরানা দিয়ে থাকলে তাদের নিকট হতে কিছু ফেরত নিওনা। (তিরমিযি, আবু দাউদ)
অত:পর উমর স্ত্রীলোকটির কথায় সম্মতি দিলেন এবং নিজের কথা উঠিয়ে নিলেন। অথচ
উমরের আয়াতটি মুখস্থ ছিল। কিন্তু তিনি তা ভুলে গিয়েছিলেন।
আলী রা. বর্ণিত এরূপ একটি হাদীস জামাল যুদ্ধের সময় আলী রা. জুবায়েরকে তাদের
উভয়ের ক্ষেত্রে রাসূলের ওয়াদা সম্পর্কে কিছু স্মরণ করালেন। জুবায়ের রা. এ কথা
স্মরণ হলে তিনি যুদ্ধ হতে বিরত থাকলেন। (আল
বেদায়া নেহায়া, বায়হাকী)
এ ধরণের ঘটনা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সালাফে সালেহীনদের মাঝে বহুল পরিমাণে
পরিলক্ষিত হয়।
ষষ্ঠ কারণ:
হাদীস আমল না করার কারণ এও হয়ে থাকে যে, ইমাম বা আলেম ব্যক্তি হাদীসের
উদ্দেশ্য সম্পর্কে অজ্ঞাত। আর যে ব্যক্তি হাদীসের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অজ্ঞাত তার ঐ
হাদীস আমল করার প্রশ্নই আসে না। নিম্নে এর কতগুলি উদাহরণ দেয়া হল।
المزابنة পাথর কিংবা
অন্য কিছু দ্বারা নির্দেশিত বস্তু বিক্রিয়।
المخابرة ক্ষেত্রের শস্যের নির্দিষ্ট অংশ বিশেষের বিনিময়ে চাষাবাদ করা।
المحاقلة ভূমির তিন বা চতুর্থাংশ
চুক্তিতে চাষাবাদ করা।
الملامسة স্পর্শ দ্বারা বিক্রিলব্ধ বস্তু নির্ধারণ
المنابزة পণ্যের উপর পাথর নিক্ষেপ পূর্বক বিক্রয়ের চুক্তি।
الغرر ধোকা পূর্বক ক্রয় বিক্রয়।
ইত্যাদি
কদাচিৎ ব্যবহৃত শব্দগুলি আলেমগণ কখনও কখনও
এসব শব্দের বিভিন্ন ব্যাখ্যা করে থাকেন।
যেমন- ১.
لاطلاق ولا إعتاق في إغلاق অর্থাৎ কারও নিকট হতে জোর পূর্বক তালাক নেয়া হলে
এবং জোরপূর্বক কারও গোলাম আজাদ করালে ঐ স্ত্রীর প্রতি তালাক ও পতিত হবে না এবং ঐ
গোলামও আজাদ হবে না। (আবু দাউদ, ইবনে
হিব্বান) ইগলাক শব্দের তফসীর ইকরাহ বা
জবরদস্তি করা হয়েছে। অথচ যারা এর বিপরীত
তাফসীর করেন তারা এই তাফসীর সম্পর্কে অভিজ্ঞ নন। আবার কখনও শব্দের প্রচলিত অর্থ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লামের মনোনীত অর্থের বিপরীত হয়ে হওয়ায় ভাষার অবস্থানের প্রতি লক্ষ্য করে রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসটি
এই আভিধানিক অর্থ প্রকাশের উদ্দেশ্যেই ব্যক্ত করেছেন। কেননা, শব্দের আভিধানিক অর্থ
ঠিক রাখাই হল মূখ্য উদ্দেশ্য।
২. نَبِيْذٌ খেজুরের রসের তাড়ি পান করার বৈধতার ব্যাপারে কেউ
কেউ হাদীস শুনেছেন। নাবীয হালাল বা হারাম হওয়া প্রসঙ্গ
সুতরাং কেউ কেউ মনে করেন نَبِيْذٌ হল এক প্রকার
মাদক দ্রব্য। কেননা তাদের প্রচলিত ভাষায় নাবীজ
মাদকদ্রব্য বিশেষ। প্রকৃতপক্ষে, খেজুর
মিশ্রিত মিষ্টি পানিকেই নাবীজ বলা হয়. যতক্ষণ পর্যন্ত তাতে নেশা না আসে। অনেক সহীহ হাদীস নাবীজের এ রূপ ব্যাখ্যা এসেছে।
হাদীসে উল্লেখিত মদের ব্যাখ্যা সম্পর্কেও
এরূপ خمر শব্দটি শ্রুত আছে। কারো কারো ধারণা মতে, শুধু মাত্র আংগুরের রসই যখন
নেশাযুক্ত হয়, তখন তাকে মদ বলা হয়। কেননা
এটাই خمر এর আভিধানিক অর্থ। যদিও অনেক সহীহ হাদীসে প্রত্যেক নেশাযুক্ত পানীয়কে মদ
বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (বুখারী , মুসলিম)
৩. আবার কখনও হাদিসের শব্দ সমভাবাপন্ন (مشترك ) কিংবা
অস্পষ্ট ( مجمل) অথবা প্রকৃত ও অন্যার্থবোধক ( حقيقة ومجاز) অর্থের মধ্যে সন্দেহের কারণে এরূপ হয়ে
থাকে। এমতাবস্থায় একজন শব্দের প্রকৃত
অর্থের নিকটতম অর্থ গ্রহণ করে, যদিও
অন্যাটা উদ্দেশ্য হতে পারে। যেমন
সাহাবাগণের এক জামায়াত প্রথমত: اَلْخَيْطُ الْأبْيَضُ وَالْخَيْطُ الْأسْوَدُ
এই আয়াতের
خَيْطٌ শব্দটি রশি অর্থে ব্যবহার
করেছেন।
৪. এমনি ভাবে কেউ কেউ فَامْسَحُوا وُجُوْهَكُمْ وَأيْدِيَكُمْ এ আয়াতের أيديكم তোমাদের হাত শব্দ বগল
পর্যন্ত অর্থে ব্যবহার করেছেন।
৫. আবার কখন ও কুরআনের আয়াত বা হাদীসের শব্দের
ইঙ্গিত গুপ্ত থাকার ফলে শব্দের অর্থের মধ্যেও মতবিরোধ সৃষ্টি হয়ে থাকে যা সকলের জানা নেই। কেননা, ভাবার্থের ইংগিত বহনকারী বিভিন্ন দিক
রয়েছে এবং এটা এতই ব্যাপক যে সকল লোক এটা উপলদ্ধির ব্যাপারে সমান নয় । এটার
বিশ্লেষণে ইমামগণ বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়েছেন এবং আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান দ্বারা
এটাকে বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে বুঝিয়েছেন।
৬.আবার কোন কোন সময় কোন ব্যক্তি কোন কোন শব্দকে
সাধারণ অর্থে ব্যবহার করেন। কিন্ত তার জানা নেই যে, বিশেষ স্থানে ঐ শব্দটি সাধারণ
অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে নাকি নির্দষ্ট অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
৭.আবার কখনও ইমামের হাদীসের শব্দের অর্থ সম্পর্কে
জানা ছিল কিন্তু পরে তা ভুলে যান। এও এক বিরাট অধ্যায়। আল্লাহ ছাড়া কারো তা নিরূপণ
করা সম্ভব নয়।
৮.আবার
কখনও কোন ব্যক্তি ভুল করে থাকেন এবং বাক্যকে এমন অর্থে ব্যবহার করেন যা রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট প্রেরিত আরবী ভাষায় প্রমাণিত হয় না।
সপ্তম কারণ:
হাদীস আমল না করার কারণ কখনও কখনও এও হয়ে থাকে যে,
বর্ণনাকারী বা মুহাদ্দিস মনে করে যে উল্লেখিত হাদীসটি আলোচ্য বিষয়ের কোন ইংগিত বহন
করে না। এই কারণ ও পূর্ববর্ণিত কারণের
মধ্যে পার্থক্য এই যে, প্রথমটির মধ্যে পূর্বাপরের দিক অজানা আর দ্বিতীয়টিতে জানা।
কিন্তু তার বদ্ধমূল ধারণা যে, এই দিকটি ঠিক নয়। কেননা, এমন কতকগুলি কায়দা কানুন
আছে যা দ্বারা এই সব দিকগুলো খন্ডন করা যায়। চাই ইমাম অথবা বর্ণনাকারীর এই কথা
সঠিক হোক অথবা ভ্রান্ত হোক।
নিম্নবর্ণিত কারণগুলো এই কারণের অন্তর্ভূক্ত :
১. হাদীস বর্ণনাকারীর এই ধারণা করা যে العام المخصوص অর্থাৎ সাধারণ হতে কতকগুলিকে বিশেষত্ব দেয়া হয়েছে,
এটা কোন মাসআলার দলিল হওয়ার উপযুক্ত নয়।
২. المفهوم المخالف কোন বস্তু হতে বিপরীত বোধগম্য বিষয়কে দলিল
হিসাবে গ্রহণ করা যায় না।
৩. العموم الورود على سبب কোন কারণের উপর অর্পিত
সাধারণ হুকুম ঐ কারণের উপরই সীমিত থাকবে।
৪. الأمر المجرد
لايقتضي الوجوب أو لا يقتضي الفور কেবল মাত্র নির্দেশসূচক হলেই তা
দ্বারা ওয়াজিব প্রতিষ্ঠা কিংবা তাৎক্ষণিক আদেশ বুঝাবে না।
৫. المعرف بالألف والام لاعموم له আলিফ
লাম দ্বারা নাম নির্দিষ্ট হলে সেটি আর অনির্দিষ্ট সাধারণ থাকে না।
৬. أن الأفعال المنفية لا تنفي ذواتها না বোধক ক্রিয়া দ্বারা বস্তুর না বাচক অর্থ
নির্দেশক হয় না। ইত্যাদি।
৭. أن المقتضى لاعموم لها Necessary এর মধ্যে অনির্দিষ্ট বুঝায় না।
কেননা তা বস্তু ইত্যাদি দ্বারা সাধারণ অর্থ বুঝায় না এই বিষয়ে বিশদ আলোচনা ও
মতামতের অবকাশ রয়েছে।
কোন
হাদীসের উপর আমল না করার জন্য উক্ত কারণটি এতই ব্যাপক যে, উছুলে ফিকহের বিরোধপুর্ণ মাসআলাগুলির প্রায়
অর্ধেক এর অন্তর্ভূক্ত, যদিও শুধু উছুল أصول বা কায়দা বিরোধপুর্ণ دلالة বা ইংগিত এর সবগুলিকে শামিল করে
না। এ ছাড়াও উক্ত কারণটির মধ্যে
دلالة এর বিভিন্ন
শ্রেণী সম্পর্কেও আরও অবহতি হওয়া যায় যে, উহার কনো প্রকার ঐ পদের অন্তর্ভূক্ত। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, কোন
ইমাম বিশেষ হাদীসের উপর এ জন্য আমল করেন না যে উহা
مجمل বা সংক্ষিপ্ত এবং উহার ভাবার্থ অষ্পষ্ট।
অষ্টম কারণ :
হাদীস আমল না করার একটি কারণ এও হয়ে থাকে যে,
হাদীসটি যে মাসআলার জন্য দলিল হিসেবে পেশ করা হয়, উহার বিপক্ষে এমন একটি দলিলও
রয়েছে যাতে মনে হয় পূর্বের দলিল সঠিক নয়।
(ক) معارضة العام بخاص যখন
অনির্দিষ্ট দলিল ও নির্দিষ্ট দলিলের মধ্যে পরস্পর দ্বব্দ্ব দেখা যায়।
(খ) المطلق بقيد সাধারণ ও বিশেষের সহিত বিরোধিতা
হওয়া।
(গ) الأمر المطلق بما ينفي الوجوب অথবা সাধারণ নির্দেশ দ্বারা ওয়াজিবকে লাযেম বা আবশ্যক না করা।
(ঘ) الحقيقة بما يدل على المجاز প্রকৃতের
সহিত অপ্রকৃত ও অষ্পষ্টের দ্বন্দ্ব হওয়া।
এ ছাড়া বাক্যের ইশারা دلالات الأقوال দ্বারা যদি বিভিন্ন মতামতের মধ্যে
স্ববিরোধ দেখা যায় তবে একটি মতের উপর অন্যটির প্রাধান্য দেয়া সহজ কাজ নয়।
নবম কারণ
الحديث معارض بما يدل على ضعفه أو نسخه أوتاويلة
এ ধারণা করা যে হাদীসটি দ্বন্দ্বযুক্ত। যাতে প্রমাণ হয় যে, ওটা দুর্বল,
রহিত কিংবা তাতে দুর্বোধ্য ব্যাখ্যা রয়েছে।
যেমন এর বিপরীতে আয়াত অথবা অন্য হাদীস অথবা ইজমা রয়েছে।
আলোচনার সার কথা হলো আপনার ধর্মবিশ্বাসের মূল হবে কুরআন ও হাদীস। কোন মানুষ
নয়। আপনি কুরআন হাদীস না জানলে বুঝতে অক্ষম হলে কোন বিজ্ঞ ধার্মিক ব্যক্তির অনুসরণ
দোষণীয় নয়। তবে যখন আপনি জানবেন যে তার কোন কোন কথা, কাজ কুরআন বা সহীহ হাদীসের
বিপরীত সাথে সাথে ঐ অংশে তার কথা ও কাজের উপর আমল ত্যাগ করতে হবে। এ কারণে যে, তার
ভুল হওয়া স্বাভাবিক। এবং এতটুকু তার বিপরীত আমল করলে তার প্রতি অসম্মান ও তার
অবমূল্যায়ন হবে না। বরং এটা ঐ ধার্মিক ব্যক্তি বা ইমামের জন্যও উভয় জাহানে নিরাপদ।
এবং অনুকরণীয় সব ইমামগণ বলেছেন যে, হাদীস শুদ্ধ হলে তার উপর আমল করবে আমার মত প্রত্যাখ্যান করবে।
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment